মায়োসিস কোষ বিভাজন : মায়োসিস এক বিশেষ ধরনের কোষ বিভাজন, যার মাধ্যমে জনন মাতৃকোষ হতে
জনন কোষ উৎপন্ন হয়। বেনেডিন এবং হাউসার (১৮৮৩) কৃমির গ্যামিটে হ্যাপ্লয়েড সংখ্যক ক্রোমোসোম
আবিষ্কার করেন। Strasburger (১৮৮৮) পুষ্পক উদ্ভিদের জনন মাতৃকোষের ক্রোমোসোমে হ্রাসমুলক বিভাজন প্রত্যক্ষ
করেন। J. B. Farmer I J. E. Moore (১৯০৫) সর্বপ্রথম হ্রাসমুলক বিভাজনকে মায়োসিস বলেন। মায়োসিস সর্বদা
জনন মাতৃকোষে সম্পন্ন হয়। কখনই দৈহিক কোষে মায়োসিস ঘটে না। মায়োসিস সর্বদাই ২হ সংখ্যক ক্রোমোসোমবিশিষ্ট
কোষে সংঘটিত হয়। নি¤œশ্রেণির জীবে (হ্যাপ্লয়েড) মায়োসিস ঘটে নিষেকের পর জাইগোটে। অপরদিকে উচ্চশ্রেণির জীবে
(ডিপ্লয়েড) মায়োসিস হয় নিষেকের পূর্বে জনন মাতৃকোষ থেকে গ্যামিট সৃষ্টির সময়। ডিপ্লয়েড জীবে গ্যামিট সৃষ্টির সময়
জনন মাতৃকোষে এবং হ্যাপ্লয়েড জীবের জাইগোটে মায়োসিস ঘটে বিধায় প্রজাতির বৈশিষ্ট্য বংশ পরম্পরায় টিকে থাকে।
মায়োসিস কোষ বিভাজনের ধাপসমূহ : মায়োসিস একটি অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কোষ, নিউক্লিয়াস এবং
ক্রোমোসোম এর বিভক্তির উপর ভিত্তি করে মায়োসিস কোষ বিভাজনকে দুটি পর্বে ভাগ করা হয়। যথা- (ক) মায়োসিস-১
এবং (খ) মায়োসিস-২। মায়োসিস প্রক্রিয়ায় একটি কোষ পর পর দু’বার বিভক্ত হয়। কোষের প্রথম বিভাজনের সময়
অপত্য কোষে ক্রোমোসোম সংখ্যা মাতৃকোষের ক্রোমোসোম সংখ্যার অর্ধেক হয়। প্রথম বিভাজনের জন্য একে মায়োসিস১ নামকরণ করা হয়েছে। যেহেতু মায়োসিস-১ এ ক্রোমোসোম সংখ্যা হ্রাস পায় তাই মায়োসিস কোষ বিভাজনকে
হ্রাসমুলক বিভাজনও বলা হয়। মায়োসিস
কোষ বিভাজনে মায়োসিস-১ সবচেয়ে
তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এ পর্যায়ে ক্রোমোসোম
সংখ্যা অর্ধেক হ্রাস পায় এবং ক্রসিং ওভার
ঘটে। একজোড়া সমসংস্থ ক্রোমোসোমের
দুটি নন-সিস্টার ক্রোমাটিড এর মধ্যে
অংশের বিনিময়কে বলা হয় ক্রসিংওভার।
এরপর কোষের দ্বিতীয় বিভাজনকে
মায়োসিস-২ বলা হয়। মায়োসিস-২ এর
প্রধান তাৎপর্য হলো দুটি কোষ থেকে চারটি
কোষের উৎপত্তি যার প্রত্যেকটিতেই
মাতৃকোষের অর্ধেক সংখ্যক ক্রোমোসোম
থাকে। এটি মূলত মাইটোসিস কোষ
বিভাজনের ন্যায়।
মাইটোসিস কোষ বিভাজনে অপত্য কোষগুলোর ক্রোমোজোম সংখ্য মাতৃকোষের সমান থাকে। বৃদ্ধি এবং অযৌন জননের জন্য মাইটোসিস কোষ বিভাজন অপরিহার্য। যৌন জননে পুং ও স্ত্রী জনন কোষের মিলনের প্রয়োজন হয়। যদি জনন কোষগুলোর ক্রোমোজোম সংখ্যা দেহকোষের সমান থেকে যায় তা হলে জাইগোট কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা জীবটির দেহকোষের দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
কোষের অর্ধেক ক্রোমোজোম সংখ্যার অবস্থাকে হ্যাপ্লয়েড (n) বলে। যখন দুটি হ্যাপ্লয়েড কোষের মিলন ঘটে, তখন সে অবস্থাকে ডিপ্লয়েড (2n) বলে। অর্থাৎ মিয়োসিস কোষ বিভাজন হয় বলেই প্রতিটি প্রজাতির বৈশিষ্ট্য বংশপরম্পরায় টিকে থাকতে পারে।
মায়োসিস কোষ বিভাজনের গুরুত্ব : জীবজগতে মায়োসিস কোষ বিভাজনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ সম্পর্কে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা
করা হলো-
ক্রোমোসোম সংখ্যা হ্রাস : যৌন জননকারী জীবে মায়োসিস বিভাজন গুরুত্বপূর্ণ। এ বিভাজনের ফলে জননকোষ তথা
গ্যামিটে ক্রোমোসোম সংখ্যা হ্রাস পেয়ে n সংখ্যক হয়। মায়োসিস না ঘটলে অহ্রাসকৃত জনন কোষের মিলনের ফলে
জীবের ক্রোমোসোম সংখ্যা দ্বিগুণ (২n), চারগুণ (৪n), আটগুণ (৮n) ইত্যাদি গুণিতকে বৃদ্ধি পেত অর্থাৎ প্রতি জনুতে
ক্রোমোসোম সংখ্যা দ্বিগুণ হত। ফলে জীবজগতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতো।
প্রজাতির স্বকীয়তা রক্ষা : জনন কোষে ক্রোমোসোম সংখ্যা অর্ধেক এবং এরূপ দুটি জনন কোষের মিলনের ফলে
মাতৃকোষে সমসংখ্যক ক্রোমোসোম বিশিষ্ট জনুর সৃষ্টি হয়। ফলে ক্রোমোসোম সংখ্যা সঠিক রাখায় বংশানুক্রমে প্রতিটি
প্রজাতির স্বকীয়তা রক্ষিত হচ্ছে।
বৈচিত্র্যের সৃষ্টি : যৌন জনন সম্পন্ন দুটি জীব কখনও হুবহু একই রকম হয় না। মায়োসিস প্রক্রিয়ায় গ্যামিট সৃষ্টিকালে
ক্রোমোসোমের ক্রসিংওভার ও স্বাধীনভাবে বিন্যস্ত হবার ফলে পৃথিবীতে এ বৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বংশবৃদ্ধি : ডিপ্লয়েড জীবে মায়োসিস প্রক্রিয়ায় গ্যামিট সৃষ্টি হয়। পরে গ্যামিটের মিলনে যৌন জনন প্রক্রিয়ায় জীবের
বংশবৃদ্ধি ঘটে।
অভিব্যক্তি ধারা : মায়োসিসের মাধ্যমে জীবে বৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয়। আর এ বৈচিত্র্য থেকে অভিব্যক্তির ধারা বজায় থাকে।