পদার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন চৌম্বক ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, চৌম্বকত্ব হচ্ছে পদার্থের পারমাণবিক ধর্ম, পদার্থের অন্তর্জাত (intrinsic) কোনো ধর্ম নয়। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, পদার্থের সকল চৌম্বক ধর্ম ইলেকট্রনের গতির সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায়। সকল পরমাণুতে ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে যেখানে ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগ হচ্ছে ℎ2𝜋 এর সরল গুণিতক। ইলেকট্রন যখন নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরে তখন তা একটি প্রবাহ লুপ তৈরি করে। আমরা জানি যে, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে তার চারদিকে একটা চৌম্বক ক্ষেত্রের উদ্ভব হয়। ইলেকট্রনের কক্ষীয় গতির ফলে যে প্রবাহ লুপ তৈরি হয় তা পারমাণবিক প্রবাহ সৃষ্টি করে । একে কখনো কখনো অ্যাম্পিয়ার প্রবাহ বলা হয়ে থাকে। এই পারমাণবিক প্রবাহ বা অ্যাম্পিয়ার প্রবাহের জন্যে কক্ষীয় চৌম্বক ভ্রামকের উদ্ভব হয় যা পদার্থে চৌম্বকত্ব সৃষ্টির জন্য মূলত দায়ী ।
যেহেতু সকল পদার্থেই ইলেকট্রন থাকে তাহলে মনে হতে পারে সকল পদার্থ চুম্বক নয় কেন? শুধু চুম্বকিত লোহা বা সামান্য গুটিকয়েক বস্তু লোহা জাতীয় বস্তুকে আকর্ষণ করতে পারে কেন? এর উত্তরে বলা যায়, বেশিরভাগ পদার্থের বিপরীতমুখী চৌম্বক ভ্রামক জোড়ায় জোড়ায় বিরাজ করে একে অপরের প্রভাব নাকচ করে দেয়। ফলে কোনো লব্ধি চৌম্বকত্ব পরিলক্ষিত হয় না। পদার্থে শক্তিশালী চুম্বকত্বের উদ্ভব তখন ঘটে যখন পরমাণুতে বিজোড় সংখ্যক ইলেকট্রন থাকে এবং কক্ষীয় চৌম্বক ভ্রামক বিশেষভাবে বিন্যস্ত থাকে। আবার এভাবেও বলা যায় যে, প্রকৃতপক্ষে সকল পদার্থই চুম্বকত্ব প্রদর্শন করে। চুম্বক বলতে আমরা ফেরোচৌম্বক পদার্থ যেমন দণ্ড চুম্বক বা কম্পাস কাঁটাকে বুঝে থাকি যাদের চৌম্বক ধর্ম যথেষ্ট শক্তিশালী, সে রকম না হলেও প্রত্যেক পদার্থেই খুব ক্ষীণ কিছু না কিছু চৌম্বকত্ব থাকে যেগুলো নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো।
কক্ষপথে ইলেকট্রনের ঘূর্ণনের ফলে সৃষ্ট চৌম্বকক্ষেত্র ও চৌম্বক ভ্রামক
বিয়োঁ-স্যাভার সূত্র থেকে আমরা জানি, একটি প্রবাহবাহী বৃত্তাকার কুণ্ডলীর কেন্দ্রে চৌম্বকক্ষেত্র পাওয়া যায়
𝐵=𝜇𝑜𝐼2𝑟
এখন e আধানবিশিষ্ট একটি ইলেকট্রনের যদি তার কক্ষপথে একবার আবর্তন করতে T সময় লাগে তাহলে তড়িৎ প্রবাহ হবে 𝐼=𝑒𝑇 । কিন্তু কক্ষপথের ব্যাসার্ধ, r এবং ইলেকট্রনের বেগ v হলে
𝑇=2𝜋𝑟𝑣 সুতরাং 𝐼=𝑒×𝑣2𝜋𝑟
:- 𝐵=𝜇𝑜2𝑟𝑒𝑇=𝜇𝑜2𝑟𝑒𝑣2𝜋𝑟
কক্ষপথে ঘূর্ণীয়মান ইলেকট্রনের কক্ষীয় চৌম্বক ভ্রামক
𝑀𝑜𝑟𝑏=𝐼𝐴=𝑒𝑣2𝜋𝑟×𝜋𝑟2=𝑒𝑣𝑟2
এখানে m = ইলেকট্রনের ভর । কিন্তু বোরের তত্ত্ব থেকে ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগ, 𝐿=𝑚𝑣𝑟=𝑛ℎ2𝜋
সুতরাং 𝑀𝑜𝑟𝑏=𝑒2𝑚×𝐿=𝑛 𝑒ℎ4𝜋𝑚.. (4.28)
প্রথম কক্ষের জন্য n = 1 ।
সুতরাং প্রথম বোর কক্ষের জন্য সৃষ্ট চৌম্বক ভ্রামকের মান 𝑀𝑜𝑟𝑏=𝑒ℎ4𝜋𝑚 । একে বোর ম্যাগনেটোন বলা হয়।
(4.28) সমীকরণের ভেক্টর রূপ হচ্ছে,
𝑀𝑜𝑟𝑏→=𝑒𝐿→2𝑚.. (4.29)
এখানে ঋণাত্মক চিহ্ন ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগ ও চৌম্বক ভ্রামকের বিপরীতমুখিতা বোঝায়। ইলেকট্রনের চার্জ ঋণাত্মক হওয়ায় এরকমটি হয়।
ইলেকট্রন স্পিন ও চৌম্বক ক্ষেত্র (Electron Spin and Magnetic field)
ইলেকট্রন হচ্ছে আধানযুক্ত কণা। একটি পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে যেমন ঘুরতে থাকে তেমনি লাটিমের মতো নিজের অক্ষের চারদিকেও পাক খায়। নিজের অক্ষের ওপর এ ঘূর্ণনকে বলে স্পিন (spin) |
এই স্পিন বা ঘূর্ণনের জন্য কৌণিক ভরবেগ সৃষ্টি হয় এবং ইলেকট্রনের ঋণাত্মক চার্জের জন্য একটি চৌম্বক মোমেন্ট Ms বা 𝜇𝑠 সৃষ্টি হয়, যার দিক স্পিনের কারণে সৃষ্ট কৌণিক ভরবেগ 𝑆→ এর বিপরীত। ইলেকট্রনের এই স্পিনের জন্য চৌম্বক মোমেন্ট ও কৌণিক ভরবেগের মধ্যে সম্পর্ক হচ্ছে,
𝜇𝑠→=-𝑒𝑚𝑆→
আমরা জানি, আধানযুক্ত কণার গতির জন্যে পরমাণুর মধ্যে প্রত্যেক ইলেকট্রন স্বতন্ত্র চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে। পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রনগুলো যে কোনো অভিমুখে ঘূর্ণায়মান থাকে। কোনো পরমাণুতে যদি সমান সংখ্যক ইলেকট্রন বিপরীত অভিমুখে ঘূর্ণনরত থাকে তাহলে একটি ইলেকট্রন দ্বারা উৎপন্ন চৌম্বকক্ষেত্র বিপরীত অভিমুখে ঘূর্ণায়মান অপর ইলেকট্রনের চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা নাকচ হয়ে যায়। অর্থাৎ ঐ পরমাণুতে কোনো লব্ধি চৌম্বকক্ষেত্র থাকে না। এ ধরনের পরমাণু দ্বারা গঠিত পদার্থই হচ্ছে অচৌম্বক পদার্থ। এ সকল পদার্থকে খুব শক্তিশালী কোনো চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে স্থাপন করলে চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে এই পদার্থের পরমাণুর ইলেকট্রনের ঘূর্ণন সামান্য প্রভাবিত হয়ে এ সকল পদার্থে খুবই ক্ষীণ চৌম্বকত্ব দেখা যেতে পারে যাকে ডারাচৌম্বকত্ব (Diamagnetism) বলে। এ ধরনের অচৌম্বক পদার্থকে ডায়াচৌম্বক পদার্থ বলে। পানি, তামা, বিসমাথ, অ্যান্টিমনি ইত্যাদি ডায়াচৌম্বক পদার্থ ।
পক্ষান্তরে কোনো পরমাণুতে যদি বিপরীত অভিমুখে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান না হয় তাহলে প্রত্যেক ইলেকট্রন দ্বারা সৃষ্ট চৌম্বকক্ষেত্র পরস্পরের ক্রিয়া নাকচ করতে পারে না। ফলে পরমাণুটি একটি লব্ধি চৌম্বকক্ষেত্র লাভ করে এবং পরমাণুটি একটি ক্ষুদ্র চুম্বক হিসেবে আচরণ করে, যাকে চৌম্বক দ্বিমেরু বা চৌম্বক দ্বিপোল (magnetic dipole) বলে। এরকম পরমাণু চুম্বক দ্বারা গঠিত পদার্থের ওপর যদি কোনো চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা না হয় তাহলে চৌম্বক দ্বিপোলগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকে বলে পদার্থটিতে কোনো লব্ধি চৌম্বকক্ষেত্র পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু যদি কোনো চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয় তাহলে এই চুম্বক দ্বিপোলগুলো আংশিকভাবে বিন্যস্ত হয়ে সামান্য পরিমাণ চুম্বকত্ব প্রদর্শন করে। এদেরকে প্যারাচৌম্বক পদার্থ (Paramagnetic material) বলে।