শ্বসন : সকল সজীব কোষেই প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রাসায়নিক ক্রিয়া বিক্রিয়া সংঘটিত হয়। এসব ক্রিয়াবিক্রিয়ার জন্য শক্তির দরকার হয়। আর এ শক্তির উৎস কোষের শর্করা, প্রোটিন, লিপিড ইত্যাদি জৈব
রাসায়নিক পদার্থ। এদের মধ্যে শর্করাই হচ্ছে শক্তির প্রধান উৎস। সজীব কোষে জৈব খাদ্য যেমন- শর্করা, প্রোটিন,
লিপিড ইত্যাদি এনজাইমের উপস্থিতিতে অক্সিজেনের সাহায্যে জারণের মাধ্যমে ভেঙ্গে শক্তি নির্গত হয় এবং উপজাত
হিসেবে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও পানি তৈরি হয়। যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ জটিল খাদ্যদ্রব্যকে ভেঙ্গে সরল
উপাদানে পরিণত করে এবং উপজাত হিসেবে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও পানি নির্গত করে তাকে শ্বসন বলা হয়। শ্বসন
প্রক্রিয়ায় যে শক্তি উৎপন্ন হয় তা জীবের শক্তি ব্যয়কারী জৈবনিক কাজে ব্যবহৃত হয়। উদ্ভিদের প্রতিটি জীবন্ত কোষেই দিন
রাত্রি ২৪ ঘণ্টা শ্বসন কার্য চলতে থাকে। কোষের মাইটোকন্ড্রিয়া ও সাইটোপ্লাজমে শ্বসন ক্রিয়া সংঘটিত হয়। তবে কোষের
মাইটোকন্ড্রিয়াই শ্বসন ক্রিয়ার প্রধান অঙ্গ। শ্বসন প্রক্রিয়ায় যে সব জটিল যৌগিক বস্তুসমূহ জারিত হয়ে সরল বস্তুতে
পরিণত হয় সে সব বস্তুকে শ্বসনিক বস্তু বলা হয়। শর্করা, প্রোটিন, চর্বি এবং জৈবিক অ্যাসিডসমূহ শ্বসনিক বস্তু হিসেবে
ব্যবহৃত হয়। সূর্যালোকের আলোক শক্তিই এ সব বস্তুতে রাসায়নিক স্থিতি শক্তি হিসেবে জমা থাকে এবং শ্বসনের ফলে
স্থিতি শক্তি গতি শক্তি হিসেবে নির্গত হয়।
শ্বসনের প্রকারভেদ : শ্বসন প্রক্রিয়ার জন্য অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তার উপর নির্ভর করে শ্বসন প্রক্রিয়াকে দু’ভাগে ভাগ
করা হয়। যথা- (ক) সবাত শ্বসন ও (খ) অবাত শ্বসন।
(ক) সবাত শ্বসন : যে শ্বসন প্রক্রিয়ায় মুক্ত অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় এবং শ্বসনিক বস্তু সম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে কার্বন
ডাইঅক্সাইড, পানি ও বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে তাকে সবাত শ্বসন বলা হয়। শ্বসন বলতে সাধারণত সবাত
শ্বসনকেই বোঝায়। উচ্চশ্রেণির সকল জীবে এ ধরনের শ্বসন প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়। সবাত শ্বসনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়
অক্সিজেন বায়ু থেকে আসে এবং ব্যাপন প্রক্রিয়ায় কোষে প্রবেশ করে, পরে কোষের পানিতে দ্রবীভ‚ত হয়। দ্রবীভ‚ত এ
অক্সিজেন শ্বসনিক বস্তুকে সম্পূর্ণ জারিত করে এবং প্রচুর পরিমাণে শক্তি উৎপন্ন করে। গøুকোজ (শর্করা) শ্বসনিক বস্তু হলে
সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি একটি সমীকরণের মাধ্যমে নি¤œরূপে প্রকাশ করা যায়
C6H12O6 + 6O2 ………….>6CO2 + 6H2O + (38 ATP)
গøুকোজ একটি উচ্চশক্তি সম্পন্ন যৌগ। সবাত শ্বসন প্রক্রিয়ায় গøুকোজ সম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে ৬৮৬ কিলোক্যালরি শক্তি
উৎপন্ন করে। শ্বসনের জটিল জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া অনেকগুলো ধারাবাহিক ধাপের মাধ্যমে ঘটে এবং প্রত্যেকটি ধাপের
বিক্রিয়া পৃথক পৃথক এনজাইম দ্বারা পরিচালিত হয়। সবাত শ্বসন প্রক্রিয়াটি প্রধানত চারটি ধাপে ঘটে। যথা- (১)
গাইকোলাইসিস, (২) এসিটাইল কো-এ সৃষ্টি, (৩) ক্রেবস্ চক্র ও (৪) ইলেকট্রন প্রবাহ তন্ত্র
(খ) অবাত শ্বসন : যে শ্বসন প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের দরকার হয় না তথা অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে সংঘটিত শ্বসনকে বলা
হয় অবাত শ্বসন। এ প্রক্রিয়ায় খাদ্যদ্রব্য সম্পূর্ণরূপে না ভেঙ্গে আংশিকভাবে ভাঙ্গে এবং কতকগুলো মধ্যবর্তী যৌগ যেমনইথাইল অ্যালকোহল উৎপন্ন করে। খাদ্য অসম্পূর্ণভাবে জারিত হবার কারণে অবাত শ্বসনে সবাত শ্বসন অপেক্ষা কম শক্তি
নির্গত হয়। উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদে অবাত শ্বসন ঘটে না। অবাত শ্বসন ঘটে নি¤œশ্রেণির কিছু উদ্ভিদে, যেমন- ব্যাকটেরিয়া,
ছত্রাক ইত্যাদি। তবে উচ্চশ্রেণির কিছু উদ্ভিদের মূলের চারদিকে মাটি বন্যায় প্লাবিত হলে ক্ষণস্থায়ী অবস্থায় অবাত শ্বসন
প্রক্রিয়া চলতে পারে।
ঈষ্ট হচ্ছে এক ধরনের এককোষী ছত্রাক জাতীয় উদ্ভিদ, এরা অবাত শ্বসনে সক্ষম। ঈষ্ট শর্করা জাতীয় খাদ্যকে এনজাইমের
সাহায্যে ভেঙ্গে অবাত শ্বসন প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাইঅক্সইড তৈরি করে এবং মধ্যবর্তী যৌগ হিসেবে ইথানল তথা ইথাইল
অ্যালকোহল তৈরি করে। অবাত শ্বসন দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়। যথা- ১।াইকোলাইসিস ও ২। পাইরুভিক অ্যাসিডের
অসম্পূর্ণ জারণ। অবাত শ্বসন প্রক্রিয়ায় সংঘটিত বিক্রিয়াটিকে নি¤œলিখিতভাবে উপস্থাপন করা যায়।
C6H12O6 ………………………..> 2C2H5OH + 2CO2 + শক্তি (ATP)
গ্লুকোজ (ইংরেজি:Glucose) ইথানল কার্বন ডাইঅক্সাইড
শ্বসনের প্রভাবক : সালোকসংশ্লেষণ-এর ন্যায় শ্বসনও কতগুলো প্রভাবক দ্বারা প্রভাবিত হয়। এগুলো বাহ্যিক এবং
অভ্যন্তরীণ এ দু’ধরনের হয়। বাহ্যিক প্রভাবকগুলোর মধ্যে রয়েছে- আলো, কার্বন ডাইঅক্্রাইড, পানি, তাপমাত্রা,
অক্্িরজেন ইত্যাদি। অভ্যন্তরীণ প্রভাবকগুলোর মধ্যে রয়েছে- এনজাইম, জটিল খাদ্যদ্রব্য, কোষের বয়স, কোষস্থ অজৈব
লবণ, কোষ মধ্যস্থ পানি, মাটিস্থ অজৈব লবণ এবং অন্যান্য প্রভাবক ইত্যাদি।
শ্বসনের গুরুত্ব : প্রত্যেক জীবের জন্য শ্বসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভিদ বা প্রাণী প্রতিটি সজীব কোষেই দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা
বিরতিহীনভাবে শ্বসন ক্রিয়া চলতে থাকে। শ্বসন ক্রিয়া বন্ধ হলে জীব কোষের মৃত্যু অনিবার্য। নি¤েœ শ্বসনের গুরুত্ব
সংক্ষেপে বর্ননা করা হলোপ্রত্যেক জীবের প্রতিটি জৈবিক প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য শক্তির দরকার। আর এ শক্তি আসে শ্বসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
কাজেই শক্তি উৎপাদন এবং সঞ্চালনের মাধ্যমে জীবের সকল জৈবিক প্রক্রিয়া পরিচালিত করার মধ্যে নিহিত রয়েছে শ্বসন
প্রক্রিয়ার প্রধান গুরুত্ব। শ্বসন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুমন্ডলে নির্গত হয়। উক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড সবুজ
উদ্ভিদ পুনরায় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করে এবং শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করে। কাজেই শ্বসন ও
সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া দুটি পৃথিবীতে জীবন প্রবাহ অব্যাহত রাখতে বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের
ভারসাম্য বজায় রাখে। শ্বসন প্রক্রিয়া উদ্ভিদের খনিজ লবণ পরিশোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। শ্বসনের হার কম
হলে খনিজ লবণ পরিশোষণের হার কমে, ফলে বৃদ্ধি ও অন্যান্য জৈবিক কার্য ব্যাহত হয়। শ্বসন প্রক্রিয়ার প্রভাব কোষ
বিভাজনের উপর পড়ে। কোষ বিভাজনের প্রয়োজনীয় শক্তি শ্বসন প্রক্রিয়া থেকে আসে। এজন্য এ প্রক্রিয়া জীবের দৈহিক
বৃদ্ধিও নিয়ন্ত্রণ করে।