Course Content
পঞ্চম অধ্যায়: খাদ্য, পুষ্টি এবং পরিপাক (Food, Nutrition, and Digestion)
0/17
ষষ্ঠ অধ্যায় : জীবে পরিবহণ (Transport in Living Organisms)
0/21
সপ্তম অধ্যায় : গ্যাসীয় বিনিময়
0/12
অষ্টম অধ্যায় : রেচন প্রক্রিয়া
0/12
দশম অধ্যায় : সমন্বয়
0/13
একাদশ অধ্যায় : জীবের প্রজনন
0/10
দ্বাদশ অধ্যায় : জীবের বংশগতি ও বিবর্তন
0/11
ত্রয়োদশ অধ্যায়: জীবের পরিবেশ
0/10
জীব বিজ্ঞান SSC Online
About Lesson

খাবারে অহরহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও বিষাক্ত কৃত্রিম রঙ মেশানো হচ্ছে। খাবারে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। আমাদের সবার জন্য এটি একটি নীরব ঘাতক হিসেবে শরীরে ঢুকে পড়ে। খাদ্যদ্রব্য মৌলিক চাহিদার অন্যতম যা ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ছোট-বড়, সচেতন-অসচেতন সবাইকে গ্রহণ করতে হয়। এমনকি পশুপাখিও তার ব্যতিক্রম নয়। আর সেই খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের অমানবিক কাজ। মানুষ ও জীবজন্তুর বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ খাদ্যের উপাদান দ্বারাই পরিচালিত হয়। আমাদের নিত্যব্যবহার্য জিনিসের মাধ্যমে এ নীরব ঘাতক আমাদের মধ্যে ঢুকে একদিকে যেমন আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে অন্যদিকে নতুন প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ফেলছে। পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে এগুলো হয়ে ওঠে বিষাক্ত খাবার। খাদ্য উৎপাদন-বাজারজাতকরণ, মাছ, মাংস সবক্ষেত্রে রাসায়নিকের ব্যবহার বেড়েছে লাগামহীনভাবে। ফলে নিরাপদ খাদ্যের বড় সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বাজারে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রস্তুতকৃত খাদ্য যেমন বিস্কুট, সেমাই, নুডলস, পাউরুটিতে কাপড়ে ব্যবহৃত রঙ মেশানো হয়। জিলাপি, চানাচুরে মেশানো হয় মবিল। মুড়িতে ইউরিয়া-হাইড্রোজন; চিনি, আটা ও ময়দায় মেশানো হয় বিষাক্ত চক পাউডার। সয়াবিন তেলে মাত্রাতিরিক্ত অ্যাসিটিক অ্যাসিড, পাম অয়েল ও ন্যাপথালিন মেশানো হয়। কার্বাইড দিয়ে পাকানো হয় ফলমূল এবং সংরক্ষণে ব্যবহার করা হয় ফরমালিন। মোড়কজাত ফলের জুসে বিষাক্ত রঙ ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। দুধে ফরমালিন, স্টার্চ, সোডা, বরিক পাউডার ও মেলামিন মেশানো হয়। দানাজাতীয় ফসল, ডাল ফসল, তেল ফসল, শাকসবজি, খেজুর, টমেটো, কলা, আম, পেঁপে, নাশপাতি, কুল, আপেল, কমলা, পেয়ারা, আনারস, জাম, জামরুল, তরমুজ, বাঙ্গি, আঙ্গুর, মাছ, মাংস, দুধ, জিলাপি, চানাচুর, বিস্কুট, কোল্ড ড্রিংকস, জুস, সেমাই, আচার, নুডলস, মুড়ি, বেভারেজ, আইসক্রিম, সুপারি, রঙিন জিরা, পানের মসলা, গুড়, কমলা ও হলুদ রঙের মিষ্টি, উজ্জ্বল সন্দেশ, বিভিন্ন মিষ্টিজাতীয় খাবার, দই, মুরগি ও মাছের খাবার ইত্যাদিতে সর্বদাই ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন রকম রাসায়নিক পদার্থ। বর্তমানে ব্যাপক ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, রক্তের উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ, ক্যানসার ইত্যাদি বড় বড় রোগের মূল কারণ হিসেবে এই ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যকে দায়ী করা হয়। বাংলাদেশ কনজ্যুমার রাইট সোসাইটির দেওয়া তথ্য মতে ভেজাল খাদ্যে প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ লোক ক্যানসারে আক্রান্ত হয়, এক লাখ পঞ্চাশ হাজার ডায়াবেটিস এবং দুই লাখ লোক কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়। যেসব ফসল ও খাদ্যদ্রব্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়। মৌসুমি ফলের উৎপাদন, বিপণন, বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণে কীটনাশক ও ভেজালের মিশ্রণের কারণে রাসায়নিক বিষ মেশানো ফল খেয়ে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি নানারকম রোগে ভোগে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, গ্যাস্ট্রিক, লিভার নষ্ট হয়ে যাওয়া, ক্যানসারসহ বিভিন্ন ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ভেজাল খাবার এবং খাবারে রাসায়নিক প্রয়োগের কারণে বেশি ভুগছে শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও বৃদ্ধরা। রাসায়নিক উপাদান মিশ্রিত খাবার খেয়ে স্বল্পমেয়াদে বমিভাব ও ডায়রিয়া হয় অনেকের। মাছকে পচন থেকে রক্ষা করতে অসাধু ব্যবসায়ীরা ফরমালিন মেশান। এ ছাড়া আমাদের দেশে বিভিন্ন কলকারখানার বর্জ্য পানিতে মিশে খাল-বিল ও নদী-নালায় চলে যায়। ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। পোল্ট্রি শিল্পে ব্যবহৃত খাবারেও রয়েছে ভেজাল ও রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি। আমাদের দেশে পোল্ট্রি খাবারে ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক, যার অধিকাংশই মানুষের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফরমালিন হচ্ছে বর্ণহীন গন্ধযুক্ত ফরমালডিহাইড। ফরমালিন হলো একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন দেখতে সাদা প্রিজারভেটিভ। ফরমালিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সংক্রমিত হতে না দেওয়া। অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাককে মেরে ফেলতে পারে। মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকারক এই পদার্থ নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, ল্যাবরেটরি, ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও বিশেষ কিছু বিধি-নিষেধ আছে। ফরমালিন হলো ননফুড গ্রেডের প্রিজারভেটিভ, তাই খাদ্যদ্রব্যে এর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষেধ। ক্যালসিয়াম কার্বাইড ধূসর কালো দানাদার রসুনের গন্ধযুক্ত রাসায়নিক পদার্থ। ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করা হয় ইস্পাত কারখানায়, ধাতব বস্তু কাটাকাটিতে বা ওয়েল্ডিং ইত্যাদি কাজে। অ্যাসিটিলিন গ্যাস ও বিস্ফোরক দ্রব্য তৈরির জন্যও এটি ব্যবহার করা হয়। বলা যেতে পারে এটি পলিথিন তৈরিরও কাঁচামাল। সময়ের সঙ্গে আমাদের জীবনে সব কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। খাদ্যাভাস থেকে শুরু করে বদলে গেছে খাদ্য সংরক্ষণ করার জিনিস, এমনকি খাবার খাওয়ার ডিশও।

কিছুকাল আগেও আমাদের রান্নাঘরে শোভা পেত লোহা, মাটি, কাসা বা পিতলের হাঁড়ি, বাটি বা চামচ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব রান্না এবং খাওয়ার জিনিসের বদলে জায়গা করে নিয়েছে মেলামাইন, সিলভার, অ্যালুমিনিয়াম, ননস্টিক প্যান কিংবা সিলিকনের নানা জিনিস। তবে আমরা খুব কম মানুষই রান্নার পাত্রের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সচেতন। এখনকার সময়ের মোটামুটি স্বচ্ছল মানুষের ঘরে অবশ্যই ফ্রাইপ্যান, মাইক্রোওয়েভ বা জ্যাকেটের মতো জিনিসপত্র থাকে। এগুলো এখন নিত্যব্যবহার্য পণ্যের তালিকায় ঢুকে পড়েছে। এমন বহু পণ্যের নাম বলা যায়, যেগুলো দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুলছে। ফ্রাইপ্যান, মাইক্রোওয়েভ বা জ্যাকেটে যে পলি অ্যান্ড পারফ্লুরোঅ্যালকাইল রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এক প্রকার রাসায়নিকের প্রলেপ থাকার কারণে এমন হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রাসায়নিকটি কৃত্রিম শ্রেণিভুক্ত। এর নাম পলি অ্যান্ড পারফ্লুরোঅ্যালকাইল পদার্থ বা সংক্ষেপে পিএফএএস। এই শ্রেণিতে ৪ হাজার ৭০০-এর বেশি যৌগ রয়েছে।
এটা সত্য যে, এই রাসায়নিক অনেক কিছুকেই সহজ করেছে। আর এই সহজীকরণের পথে তার যে বৈশিষ্ট্যটি সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছে, তা হলো এর স্থায়িত্ব। এ কারণে আজ যে ফ্রাইপ্যান কেনা হলো, তা প্রতিদিন ব্যবহারের পরও প্রায় অবিকৃত অবস্থায় থেকে যাবে দীর্ঘদিন। কিংবা যে জ্যাকেট পরা হচ্ছে, তা ঝড়-বৃষ্টি ইত্যাদি ডিঙিয়ে ঠিকই পানিরোধী থেকে যাচ্ছে। এই যে দীর্ঘ স্থায়িত্ব, এর কারণেই এই রাসায়নিককে ‘চিরকালীন রাসায়নিক’ বলা হয়। পানি, ধুলা, এমনকি মানুষের রক্তেও এই রাসায়নিকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। খাদ্য প্যাকেজিং থেকে শুরু করে প্রসাধনী এবং আসবাবপত্রেও এই রাসায়নিক পাওয়া যায়। নানাভাবে এই রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করে। কিন্তু এটা তো শরীরের স্বাভাবিক উপাদান নয়। ফলে বাইরে থেকে শরীরে প্রবেশ করা এই রাসায়নিক লিভারে ক্ষতি, ক্যানসার, জন্মগত নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে রান্না করার পাত্র হিসেবে ননস্টিকের প্যান খুবই জনপ্রিয়। দাম কিছুটা বেশি হলেও কম তেলে রান্না করা যায় বলে স্বাস্থ্য সচেতন অনেকের প্রথম পছন্দ ননস্টিক প্যান। তবে, ননস্টিক প্যানগুলোতে ননস্টিকের কোটিংয়ের জন্য ব্যবহৃত ‘পারফ্লুরোওরাকিল’ বা পিএফসিএস নামক রাসায়নিক পদার্থ মানবদেহ এবং পরিবেশ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত। ‘পারফ্লুরোওরাকিল’ নামক এই উপাদানটির কারণে মানবদেহে উচ্চ কোলেস্টেরল, অনিয়ন্ত্রিত থাইরয়েড, লিভারে প্রদাহ এবং খর্বকায় শিশু জন্ম নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ননস্টিক পাত্রে রান্না করলে কম তাপে রান্না করা ভালো। তবে শুধু যে ননস্টিক পাত্র থেকেই আপনার স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তা কিন্তু নয়।

পিএফএএস গোষ্ঠীর বহুল ব্যবহৃত রাসায়নিক পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন (পিটিএফই)। মূলত পানিরোধী স্বভাবের জন্যই এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। টেফলন নামে সমধিক পরিচিত এই রাসায়নিকের বিকল্প এরই মধ্যে খুঁজে বের করেছে অরগানোক্লিক নামে সুইডিশ এক প্রতিষ্ঠান। তারা এই বিকল্প রাসায়নিকটির নাম দিয়েছে অরগানোটেক্স। ১৯৪১ সালে বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ডুপন্ট এই টেফলনের পেটেন্ট নিয়েছিল। তারপর থেকে মোটামুটি এর রাজত্ব শুরু হয়, যা আজও চলছে। মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে মহাকাশে নভোচারীদের সঙ্গী পর্যন্ত হয়েছে এই টেফলন। পানিরোধী, হালকা, অতি কম মাত্রার ঘর্ষণ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য একে ভীষণ জনপ্রিয় করে তোলে। এখন এই অতিব্যবহার ও এর ক্ষতিকর প্রভাবের জেরে বিকল্প রাসায়নিকের দিকে চোখ দিতে হলো মানুষকে। অ্যালুমিনিয়ামের হাড়ি বা কড়াই রান্নার জন্য খুবই সহজলভ্য। ব্যবহারে সুবিধা থাকার কারণে প্রায় প্রতিটি ঘরেই রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয় অ্যালুমিনিয়ামের নানা জিনিস। তবে, এ ধরনের পাত্রও বিশেষ কিছু খাবারের সঙ্গে বিক্রিয়া করতে পারে। এনামেল কোটেড কাস্ট আয়রনের পাত্র ‘সাধারণ আয়রনের’ পাত্রের তুলনায় নিরাপদ। কারণ, রান্নার সময় এটি লোহা নিঃসরণ করে না। এ ধরনের গ্যাস কোটিংয়ের মাধ্যমে তৈরি হয় বলে তাপ হয় একেবারে লোহার কড়াইয়ের মতো কিন্তু তাপে লোহা নিঃসরণ করে না। সব ধরনের রান্নার জন্য এটি নিরাপদ। সারা বিশে^ই ক্ষতিকর রাসায়নিক নিয়ে একটা জনমত গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে এই সচেতনতা পলিথিনে সীমাবদ্ধ। এই নীরব ঘাতক ব্যবহার আমাদেরকে সচেতন হতে হবে আমরা যদি এখন থেকে সচেতন না হই তাহলে এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে আমাদের ওপর যা পূরণ করা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়বে। খাবারে রাসায়নিক দ্রব্য রোধের জন্য মানুষের সচেতনতা খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সচেতন মহলকেই এগিয়ে আসতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে ভেজালের ব্যাপ্তি ও পরিণতি ব্যাখ্যা করতে হবে, এগুলো থেকে বেঁচে থাকার পথও দেখাতে হবে। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধ করার যত ব্যবস্থা তা নিতে সরকারসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে রোগব্যাধির সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং চিকিৎসার জন্য অর্থনৈতিক দৈন্যসহ নানামুখী চাপে মানুষ হিমশিম খাবে। রোগব্যাধি যেমন বাড়বে, তেমনি তৈরি হবে মেধাশূন্য জাতি, যা দেশের জন্য এক ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনবে।