কোন কিছু জানার আগ্রহ থেকেই জন্ম নেয় বিভিন্ন প্রশ্ন। আর এ সকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন হয়
অনুসন্ধানের। যেমন- যদি বাতাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ জন্মে, তবে প্রথমেই প্রশ্ন আসবে বাতাস কী?
বাতাসের উপাদানসমূহ কী কী? আর এসকল প্রশ্নের উত্তর খুজতে প্রয়োজন অনুসন্ধান। আর অনুসন্ধান করার
উপায় হল গবেষণা। বিজ্ঞানে অনুসন্ধান ও গবেষণা কাজের নিয়মকে বলা হয় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও
পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সুসংবদ্ধভাবে জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি হল বিজ্ঞান। আর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হল এমন এক
পদ্ধতি যার মাধ্যমে বিজ্ঞানের বিভিন্ন নীতি, তত্ত¡ ও সূত্র ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নি¤েœ রসায়নে অনুসন্ধান ও গবেষণা
কাজে যে সকল ধাপসমূহ ধারাবাহিক ভাবে অনুসরণ করতে হয় তা ব্যাখ্যা করা হলঃ-
(১) বিষয়বস্তু বা সমস্যা নির্বাচন
(২) বিষয়বস্তু বা সমস্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ
(৩) প্রাপ্ত তথ্য থেকে অনুমিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ
(৪) পরীক্ষার পরিকল্পনাকরণ ও পরীক্ষণ
(৫) পরীক্ষালব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ এবং অনুমিত সিদ্ধান্ত যাচাই
(৬) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ
(৭) ফলাফল প্রকাশ।
ক)বিষয়বস্তু বা সমস্যা নির্বাচন ঃ অনুসন্ধান ও গবেষণা কাজের প্রথম ধাপ হচ্ছে সমস্যা নির্বাচন বা বিষয়বস্তু নির্ধারণ।
সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করে তার উপর ভিত্তি করে অনুসন্ধান ও গবেষণা কাজের বিষয়বস্তু নির্বাচন করা হয়।
যেমনঃ- লোহার তৈরি জিনিসপত্রে মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যায়। এ মরিচা ধরার কারণ কী? এ সমস্যা কীভাবে দূর করা
যায়? ধরা যাক, এই সমস্যাটি অনুসন্ধান বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমাধান করার জন্য নির্বাচন করা হল।
খ) বিষয়বস্তু বা সমস্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ঃ অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু বা সমস্যা ভালভাবে বুঝতে হলে বিষয়বস্তু বা সমস্যা
সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এজন্য বিষয়বস্তু বা সমস্যা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। অনুসন্ধান
বা গবেষণা কাজের জন্য বিভিন্ন রেফারেন্স বই, গবেষণা প্রকাষণা এবং অন্যান্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়।
অতপর প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তথ্যগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করে সমস্যা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে
হয়। এ থেকেই সমস্যার সমাধান করতে হলে কিভাবে অগ্রসর হতে হবে তা নির্ধারণ করা যায়। সাধারণত নির্বাচিত
সমস্যার সমাধান অনুসন্ধানের জন্য এমন কতগুলো প্রশ্ন খুঁজে বের করতে হয় যার উত্তর পেলেই সমস্যার সমাধান
পাওয়া যাবে। যেমনঃ মরিচা সম্পর্কে নি¤œ লিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হতে পারে১. মরিচা কিরূপ আবহাওয়ায় বেশি ধরে?
২. মরিচা কি ভেজা অবস্থায় বেশি ধরে?
৩. মরিচা কি শুষ্ক অবস্থায় বেশি ধরে?
৪. লোহার খোলা অংশে বেশি মরিচা ধরে?
৫. মরিচা কি লোহার আবৃত অংশে বেশি ধরে
৬. মরিচা দূর করার উপায় কি?
এবার বিভিন্ন বইপত্র এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে মরিচা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে
মরিচা সম্পর্কে উপরে উল্লেখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যেতে পারে।
গ) প্রাপ্ত তথ্য থেকে অনুমিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ঃ সমস্যা সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের করে সমস্যার আনুমানিক বা সম্ভাব্য
সমাধান বের করা হয়। এভাবে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তকে অনুমিত সিদ্ধান্ত বলা হয়। একই সমস্যার জন্য অনেকগুলো অনুমিত
সিদ্ধান্ত হতে পারে। সবগুলোকে লিপিবদ্ধ করতে হবে। যেমনঃ মরিচা সম্পর্কে নির্বাচিত প্রশ্নগুলোর উত্তর নিচে দেওয়া
হলো।
১। বৃষ্টিবহুল আবহাওয়ায় মরিচা বেশি ধরে।
২। শুষ্ক অবস্থায় মরিচা ধরে না।
৩। ভেজা অবস্থায় মরিচা ধরে।
৪। লোহার জিনিস খোলা অবস্থায় মরিচা ধরে।
৫। লোহার জিনিস আবৃত অবস্থায় মরিচা ধরে না।
৬। লোহার জিনিসে তেল বা গ্রিজ মেখে রাখলে মরিচা ধরে না।
এবার সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে অর্থাৎ প্রাপ্ত উত্তরগুলো বিশ্লেষণ করে মরিচা ধরার কারণ সম্পর্কে অনুমিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ
করতে হবে। উপোরোক্ত উত্তর গুলো থেকে দেখা যায় যে লোহার জিনিস আবৃত অবস্থায় বা তেল/গ্রিজ মাখানো
অবস্থায় মরিচা ধরে না। অর্থাৎ যখন বাতাসের সংস্পর্শে থাকে না তখন মরিচা ধরে না। আবার শুষ্ক অবস্থায় মরিচা
ধরে না কিন্তু ভেজা অবস্থায় মরিচা ধরে। আর্থাৎ পানির সংস্পর্শে মরিচা ধরে। সুতরাং বলা যায় লোহার জিনিস পানি ও
বাতাসের সংস্পর্শে থাকলে মরিচা ধরে।
অনুমিত সিদ্ধান্ত ঃ
১) বাতাসের সংস্পর্শে থাকলে লোহাতে মরিচা ধরে।
২) পানি ও বাতাসের সংস্পর্শে থাকলে লোহাতে মরিচা ধরে।
৩) পানির সংস্পর্শে থাকলে লোহাতে মরিচা ধরে।
ঘ) পরীক্ষার পরিকল্পনাকরণ ও পরীক্ষণ ঃ অনুমিত সিদ্ধান্ত সঠিক কিনা তা যাচাই করা অনুসন্ধান কাজের পরবর্তী ধাপ।
এই আংশে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অনুমিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বর্জন করা হয় অথবা অনুমিত সিদ্ধান্তকে
সংশোধন করে গ্রহণ করা হয়। রসায়নের অনুসন্ধান কাজের ক্ষেত্রে অনুমিত সিদ্ধান্ত সঠিক কিনা তা যাচাইয়ের জন্য
পরীক্ষাগারে পরীক্ষার মাধ্যমে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। এজন্য যথাযথ পরীক্ষার পরিকল্পনা ও পরীক্ষণ কাজ
সম্পন্ন করে তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- উপরোক্ত সিদ্ধান্ত “পানি ও বাতাসের সংস্পর্শে থাকলে
লোহাতে মরিচা ধরে।” যাচাই করার জন্য তিনটি পরীক্ষা কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
প্রথম পরীক্ষা ঃ একটি লোহার দন্ড একটি বায়ুরোধি পাত্রে শুষ্ক বাতাসে রেখে দিতে হবে।
দ্বিতীয় পরীক্ষা ঃ একটি ভেজা লোহার দন্ডকে খোলা অবস্থায় বাতাসে রেখে দিতে হবে।
তৃতীয় পরীক্ষা ঃ একটি পাত্রে ফুটন্ত পানিতে লোহার দন্ড ডুবিয়ে তা বায়ুরোধি করে রেখে দিতে হবে
ঙ) পরীক্ষার ফলাফল থেকে অনুমিত সিদ্ধান্ত যাচাই ঃ পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলের উপর ভিত্তি করে অনুমিত সিদ্ধান্ত যাচাই
করে তা গ্রহণ, বর্জন বা সংশোধন করা হয়ে থাকে। পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় বলে
এটিই অনুসন্ধান কাজের বা সমস্যার প্রকৃত সমাধান। অর্থাৎ এখানে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তা প্রমাণিত সত্য। যেমনঃ
ইতোপূর্বে গৃহীত প্রথম ও তৃতীয় পরীক্ষায় দেখা যায় যে লোহার দন্ডে কোন মরিচা ধরেনি, তবে দ্বিতীয় পরীক্ষায়
লোহার দন্ডে মরিচা ধরেছে। সুতরাং দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ বাতাস ও পানির সংস্পর্শে লোহার উপর
মরিচা ধরে।
চ) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ঃ এবার পরীক্ষার মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্ত পুনরায় আরও কয়েকবার পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা
হয়। যদি প্রতিবার একই ফলাফল পাওয়া যায় তবে উক্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা হয়। এভাবে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তই
অনুসন্ধান কাজের বা সমস্যার সমাধান হিসেবে চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা হয়। যেমনঃ ইতোপূর্বে গৃহীত সিদ্ধান্ত
পূণ:পরীক্ষার জন্য কতগুলো লোহার দন্ডকে ভেজা অবস্থায় খোলা বাতাসে কয়েক দিন ফেলে রাখতে হবে। যদি দেখা
যায় যে লোহার দন্ডগুলোতে মরিচা ধরেছে, তবে সিদ্ধন্তটি চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা যাবে। অর্থাৎ পানি ও বাতাসের
সংস্পর্শে থাকলে লোহায় মরিচা ধরে।
ছ) ফলাফল প্রকাশ ঃ অতপর অনুসন্ধান কাজের বা সমস্যা সমাধানের বিস্তারিত প্রক্রিয়া ও গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ লিপিবদ্ধ
করে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়।
রাসায়নিক দ্রব্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা
মাধ্যমিক পর্যায়ে রসায়ন শিক্ষায় তত্ত¡ীয় বিষয়ের সাথে কিছু ব্যবহারিক কাজও অন্তর্ভূক্ত আছে। পরীক্ষাগারে এসকল
ব্যবহারিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়। এজন্য রাসায়নিক পদার্থ
সংরক্ষণ ও নিরাপদ ব্যবহারের কৌশল সম্পর্কে শিক্ষার্থীর জানা প্রয়োজন।
বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের কিছু কিছু ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য আছে যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আবার কিছু কিছু
রাসায়নিক পদার্থ আছে যা থেকে অগ্নিসংযোগ বা অন্য কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এজন্য রাসায়নিক পদার্থের পাত্রের
গায়ে ঝুঁকির মাত্রা বোঝানোর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত সতর্কতামূলক সাংকেতিক চিহ্ন মুদ্রিত থাকে। নি¤েœর ছকে
কতগুলো সাধারণ সাংকেতিক চিহ্ন ও তা দ্বারা প্রকাশিত ঝুঁকি ও সাবধানতার বিবরণ দেওয়া হল।