ভূমিকা
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন বস্তু যেমন, বই, খাতা, কলম, চেয়ার, টেবিল, পানি, বরফ, জলীয় বাষ্প, তেল,
দুধ, কেরোসিন, তরল পানীয়, সোডা ওয়াটার ইত্যাদি সব পদার্থ। এদের ভর ও আয়তন আছে। পদার্থের সাধারণত তিন
অবস্থা-কঠিন, তরল ও বায়বীয়। কক্ষ তাপমাত্রায় বেশির ভাগ পদার্থই কঠিন হলেও তরল ও বায়বীয় অবস্থাতেও পদার্থ
অবস্থান করে। তাপমাত্রার পরিবর্তন পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। পদার্থের এ তিন অবস্থার মধ্যে আবার বেশ
সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও ধর্ম বর্তমান। পদার্থের ভৌত অবস্থার পরিবর্তন ঘটলেও সাধারণত অণুর গঠনের তেমন কোনো
পরিবর্তন ঘটে না। সাধারণ তাপমাত্রা ও চাপে কঠিন পদার্থের আকার ও আয়তনের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তরলের
ক্ষেত্রে আয়তন ঠিক থাকলেও আকারের পরিবর্তন ঘটে। পানিকে গøাসে রাখলে গøাসের আকার ধারণ করে এবং বোতলে
রাখলে ঐ বোতলের আকার ধারণ করে। বায়বীয় পদার্থের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন আকার ও আয়তন থাকে না। পদার্থের
অবস্থার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা বিশেষ ভ‚মিকা রাখে।
বাজারে বিভিন্ন ধরনের ধাতব মুদ্রা পাওয়া যায়। আবার কেউ বা প্রাচীন কালের পুরান ধাতব মুদ্রা
সংগ্রহ করেও মজা পায়। পুরান মুদ্রার ওপর অনেক সময় ময়লা জমে গিয়ে এর আসল বর্ণ পরিবর্তন করে ফেলে। একে
পলিশ ক্রিম দ্বারা পলিশ করে নিলেই পূর্বের সুন্দর বর্ণ ফিরে আসে। আবার একটি কাঁচ বা মেলামাইন বা পোর্সেলিন এর
পাত্রে সামান্য লেবুর রস বা তেঁতুল গোলা নিয়ে তার মধ্যে পুরনো মুদ্রাগুলো কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখলে এগুলো পরিষ্কার হয়ে
উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করে। একইভাবে পাত্রের মধ্যে সামান্য ভিনেগার নিয়ে তার মধ্যে মুদ্রা গুলোকে ডুবালে একই ফলাফল
দেখতে পাবে। এবার একটি কাঁচের বিকারের মধ্যে অত্যন্ত ক্ষয়কারী পদার্থ নাইট্রিক এসিড নিয়ে তার মধ্যে একটি বা দু’টি
মুদ্রা ফেলে দাও। দেখবে বুদবুদ আকারে কী যেন বেরিয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকারের উপরিভাগে লালচে বাদামী
বর্ণের ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়েছে গিয়েছে। বিকারের দ্রবণ নীল বর্ণ ধারণ করেছে এবং মুদ্রা গুলো কিছুটা হলেও ক্ষয়ে গিয়েছে।
লালচে বাদামী বর্ণের ধোঁয়া, নীল বর্ণের দ্রবণ এবং ক্ষয়ে যাওয়া ধাতব মূদ্রা এর সকলেই পদার্থ। এগুলি পদার্থের তিনটি
অবস্থা মাত্র। লালচে বাদামী বর্ণের ধোঁয়া পদার্থের গ্যাসীয় অবস্থা, বিকারের নীল বর্ণের দ্রবণ পদার্থের তরল অবস্থা এবং
ধাতব মুদ্রা পদার্থের কঠিন অবস্থা।
১. কঠিন পদার্থ : ইট, কাঠ, পাথর, মোবাইল ফোন, শুষ্ক ব্যাটারী, বই, গøাস, প্লেট ইত্যাদি।
২. তরল পদার্থ : দুধ, সরিষার তৈল, পানি, পারদ, কেরোসিন তৈল, সয়াবিন তৈল, তরল পানিয়, ফলের জুস,
অ্যালকোহল ইত্যাদি।
৩. গ্যাসীয় পদার্থ : অক্সিজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, আমোনিয়া ইত্যাদি।
পদার্থ ও পদার্থের বিভিন্ন অবস্থা :
রসায়ন শাস্ত্রে পদার্থ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। কিন্তু আসলে পদার্থ কী? ধাতব মুদ্রা, নাইট্রিক এসিড এবং উৎপন্ন
লালচে বাদামী বর্ণের গ্যাস যা মূলত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড এরা সকলেই পদার্থ। এদের সকলেরই ভর আছে, জায়গা
দখল করে এবং এদের জড়তা আছে। এদের সকলেরই ভৌত অবস্থা ভিন্ন। কেনই বা এমনটি হয়। আবার রাবার কেন্
নরম হয় এবং ইট কেন শক্ত হয়। বাতাস কেন গ্যাসীয় হয়, ধাতব মূদ্রা কেন কঠিন হয়। তুলা কেন নরম এবং লম্বা
পুতুলের ন্যায় হয়। চিনি কেন দানাদার, খাবার লবন কেন ঘনক আকারের হয়। এসব প্রশ্নের উত্তর একটিই-সেটি হলো এ
সবই পদার্থের ভৌত অবস্থা মাত্র। পদার্থের ভৌত অবস্থা নির্দেশ করে পদার্থের সংযুক্তি অপরিবর্তিত রেখে উহার বিভিন্ন
অবস্থার প্রকাশ। পদার্থের ভৌত অবস্থার মধ্যে পড়ে পদার্থের ঘনত্ব, স্থায়ীত্ব, স্ফুটনাঙ্ক, দ্রাব্যতা, চৌম্বক ধর্ম, আলোর সাথে
প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি। আবার কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় অবস্থা এ সবই কিন্তু পদার্থের ভৌত অবস্থা।
তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটলে পদার্থের ভৌত অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। কঠিন বরফকে তাপ দিলে তরল পানি, পানিকে তাপ
দিলে গ্যাসীয় অবস্থা বাষ্পে পরিণত হয়। বিপরীত ভাবে জলীয় বাষ্পকে ঠাÐা করলে তরল পানি, তরল পানিকে ঠাÐা
করলে কঠিন বরফে পরিণত হয়। আবার কর্পূর, আয়োডিন, নিশাদল এ সব কঠিন পদার্থকে তাপ দিলে সরাসরি কঠিন
অবস্থা থেকে গ্যাসীয় অবস্থায় পরিবর্তিত হয়। আবার গ্যাসীয় অবস্থা থেকে শীতল করলে তরল অবস্থায় পরিণত হয়ে
সরাসরি কঠিন অবস্থা প্রাপ্ত হয়। প্রকৃত পক্ষে এদরকে উদ্বায়ী পদার্থ বলে।
তবে উপরিউক্ত তিনটি ধাপের পরিবর্তনের ক্ষেত্রেই পদার্থ তার রাসায়নিক সংযুক্তির কোনো পরিবর্তন ঘটায় না। ফলে
এগুলো ভৌত পরিবর্তন। একটি কাঁচ পাত্র ভেঙ্গে গেলে, লোহা চুম্বকে পরিণত হলে, মোমকে তাপ দিয়ে গলালে পদার্থের
ভৌত পরিবর্তন হয়।
টেস্টটিউবের ঘন নাইট্রিক এসিডের মধ্যে ধাতব মুদ্রা ফেলে দিলে দ্রবনের
বর্ণ নীল রঙ এবং লালচে বাদামী বর্ণের গ্যাস নির্গত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে
মুদ্রার ধাতব উপাদানের একটি কপার ধাতু। এর সাথে নাইট্রিক এসিডের
বিক্রিয়ার ফলে দ্রবনীয় নীলবর্ণের কপার নাইট্রেট লবণ এবং লালচে
বাদামী বর্ণের নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়েছিল। এক্ষেত্রে
পদার্থের রাসায়নিক সংযুক্তির পরিবর্তন ঘটেছে। এ জাতীয় পরিবর্তন
রাসায়নিক পরিবর্তন।
পানিতে দুই-চার ফোঁটা লঘু সালফিউরিক এসিড যোগ করে তড়িৎ প্রবাহ
চালনা করলে পানি বিয়োজিত হয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি উপাদান অক্সিজেন ও
হাইড্রোজেন উৎপন্ন করে। এটিও রাসায়নিক পরিবর্তন।
উপরের আলোচনার পর নিশ্চিয়ই আপনারা জেনে গিয়েছেন যে, পদার্থের সাধারণ অবস্থা হলো তিনটি- কঠিন, তরল ও
গ্যাসীয় বা বায়বীয়।
কঠিন পদার্থ :
কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন থাকে। কঠিন পদার্থের অণুগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ বল খুবই তীব্র।
যেমন- ইট, কাঠ, লোহা, সোনা, রূপা, কয়লা, চাল, গম ইত্যাদি।
তরল পদার্থ :
তরল পদার্থের কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই, তবে নির্দিষ্ট আয়তন আছে। একে যখন যে পাত্রে রাখা যায় সে পাত্রের আয়তন
ধারণ করে। পানিকে কলসীতে রাখলে কলসীর আকার, বোতলে রাখলে বোতলের আকার, গøাসে রাখলে গøাসের আকার
ধারণ করে। দুধ, পানি, অ্যালকোহল, কেরোসিন তেল, নারিকেল তেল, সয়াবিন তেল এ সকল তরল পদার্থ যা পূর্বেই
আপনারা জেনেছেন।
গ্যাসীয় পদার্থ :
গ্যাসীয় পদার্থের নির্দিষ্ট আকার বা আয়তন নেই, তবে এর নির্দিষ্ট ওজন আছে। এ ধরনের পদার্থকে যে পাত্রেই রাখা হোক
না কেন সে পাত্রকে পূর্ণ করে রাখে। যে পাত্রে গ্যাসীয় উপাদানকে রাখা হয় সে পাত্রের আয়তনই তার আয়তন, সে পাত্রের
আকারই তার আকার। পূর্বেই জেনেছেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, অ্যামোনিয়া -এরা
সকলেই গ্যাসীয় পদার্থ। গ্যাসীয় পদার্থের অণুগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ নেই বললেই চলে।
নিচের চিত্রে কিছু কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের চিত্র দেওয়া হলো। এগুলোকে ভালমতো দেখুন এবং চেনার চেষ্টা
করুন।